রাত সাড়ে আটটা। চারিদিক অন্ধকার। দূরে নোঙর করা এক জাহাজের মিটিমিটি আলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। লোকেরা চলে গেছে যার যার ঘরে। শুধু আমরা দুজন বসে আছি।
“এবার উঠতে হবে সতী”।
“হাঁ, চলো”।
পাড় থেকে উঠে এলাম। বসলাম এসে সুইমিং পুলের পাশে বিছানো দুটা হেলান দেওয়া চেয়ারে। সন্ধায় পুলে নামা নিষেধ। কিছু দূরে আলোর নিচে এক মেয়ে স্বল্প কাপড় পড়ে শুয়ে আছে। আমাদের জায়গাটা আলো আধারে ভরা । পিছনে ছোট ছোট গাছের ভিতর থকে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। ওরা চুপ করলে চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু আমাদের দুজনের কথা, সতী বলছে তার স্মৃতির ভাজে ভাজে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।
ছোট বেলা, পায়ের নুপুরের টুংটাং শব্দ। আলতা পায়ে বাবা কে বলেছিল,”দেখত বাবা আমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, তাই না”?
“হাঁ মা, রাজপুত্র আসবে রাজকন্যা কে নিতে”।
এসেছিল, আবার চলেও গেলো। সতীর কান্নায় বুজে আসা গলা। আমি তাকালাম ওর দিকে। পাশের ল্যাম্পপোস্ট থেকে আলোর রশ্মি এসে পড়েছে ওর চোখের জলের উপর। চিকচিক করছে হীরের কনার মত। ও তাকাল আমার দিকে।
“চলো, রাত সাড়ে নটা হোল। ডিনারে বসে শুনবো অন্য কথা”।
থাই রেস্টুরেন্ট টা সতী পছন্দ করে রেখেছিল। আমরা যেয়ে বসলাম। সতী মেন্যু উল্টিয়ে দেখে দুটো আইটেম আনতে বলল। সাথে একটা এপিটাইযার। জিজ্ঞাসা করলো, আমি মেন্যু টা দেখব কি না?
বললাম,” দরকার আছে কি”?
বলল,” জানি তুমি কোনদিনই কোন কিছু চয়েস করনি। তোমার কথায়, তুমি বাচার জন্য খাও, খাওয়ার জন্য বাচো না।“
“তুমি মনে রেখেছ কথাটা, দেখছি”?
ও কোন উত্তর দিলো না।
খাবার এলো। সতী কে বললাম,” তোমার Item Selection এর তারিফ না করে পারছিনা”।
ও হাসল। “ কেমন হয়েছে খাবার গুলো?”
“খুউব ভালো। সেইজন্যই তো মেন্যু নিয়ে ঘাটাঘাটি আমি করিনি”।
খাওয়া শেষে বেড়িয়ে এলাম রাস্তায়। চারিদিক ঝলমল করছে চাঁদের আলোতে। শুধু আমরা দুজন রাস্তায়। মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ী পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। পাশের পাহাড় বেয়ে আলোর ঝরনা ঝরে ঝরে পড়ছে। রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে একজন কাসার থালে টুংটুং করে বাজনা বাজাচ্ছে। চোখ বন্ধ। অন্ধ কি না জানিনা।
সতী গুনগুণ করে গেয়ে উঠলো,” ধন্য ধন্য ও বলি তারে—————– “ দু এক বার গেয়ে থেমে গেলো।
বললাম,” থামলে কেন”?
“ আর তো জানিনা”।
“ ঐ লাইন টাই বার বার গাও, শুনতে ভালো লাগছে এই পরিবেশে।“
সতী গুন গুনিয়ে উঠলো।
আমি ফিরে গেলাম দূরে,বহু দূরে টেমস নদীর পাড়ে। সেই রাতেও ছিল পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে। সে বলেছিল,” তোমার বেসুরো গলায় গাও তো সেই গানটি,” আমারও পরানো যাহা চায়, তুমি তাই, তাই গো—–“
আজ মনে হোল পরিবেশ এক, পটভূমি আলাদা, সম্পর্ক আলাদা।
হাত বাড়ালেই যাকে পাওয়া যেতো, না চাইতেই যে কাধে মাথা রাখতো সে আজ বহু দূরে। আজ যে কাছে সে কাছে থেকেও মনে হয় অনেক দূরে। তবুও সময় কাটে ওর সাথে। এটাও তো বড় পাওয়া। ভাবি, কোন দমকা হাওয়ায় এই সেঁকো যেন ছিড়ে না যায়।
কি ভাবছ?
ভাবছিলাম আমার অতীত। তুমি তো বলেছিলে, ভবিষ্যৎ ভেবোনা, তুমি ওটা জাননা, বর্তমান আমার পথের পাথেয়। তাই অতীত আর বর্তমানের মধ্যে যোগ সুত্র বাধতে চাইছিলাম।
“ মাঝে মাঝে তোমার কথার মাথা মুণ্ডু খুজে পাইনা। এইযে এসে গেছি আমাদের ভিলাতে। আচ্ছা সত্যি করে বলতো কি ভাবছিলে?”
“ বললাম তো, অতীত”।
“ অতীত কে টেনে এনো না, তাতে শুধু দুঃখই পাবে। বর্তমানকে আঁকড়িয়ে ধরো”।
“ আচ্ছা, জানো মাঝে মাঝে তুমি দার্শনিকদের মতো কথা বলও”।
“ ঠেকে শিখেছি। এখন বলও কাল গাড়ী আসবে কখন”?
“আটটায়। তবে সাতটায় আমরা নিচে নামব নাস্তা করতে। তোমাকে কি ঘুম থেকে উঠাতে হবে”?
“না, তুমি নামার আগে আমাকে কল করো”।
দুজনে এসে দাঁড়ালাম যার যার ঘরের সামনে।
শুভরাত্রি, বলে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সকাল সাতটা। এসে বসলাম ব্রেকফাস্ট রুমে। সতীর পরনে নীল কামিজ, সাদা সালওয়ার, মাথার উপর আলতো করে টানা নীল ওড়না। মনে হোল সাজতে যেয়ে জানালা দিয়ে বাহিরের আকাশ টা দেখেছিল সে। আকাশে নীলের ছড়াছড়ি।
অপূর্ব লাগছিল দেখতে ওকে। বললাম,” তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে”?
সলজ্জ নয়নে তাকাল সে আমার দিকে।
লোকজনের আনা গোনা ততটা নয়। বিভিন্ন জাগায় বিভিন্ন রকমের খাবার। এক জাগায় বাবুর্চি মাথায় কাগজের টুপি, গায়ে আপ্রন পড়ে ডিম ভাজছে। অন্য খানে একজন পরাটা আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট করতে ব্যস্ত।
দুটা পরাটা সাথে দুটা ডিম পোঁচ আর একটা ডেনিস নিয়ে এলাম। কফি আমার চাই খাবারের সাথে। সতী ঘুরে ঘুরে দেখছিল কোথায় কি কি আছে। অবশেষে সে নিয়ে এলো দুটা পাউরুটি টোস্ট আর একটা অমলেট। এক প্লেট ভরা ফলমূল। আমাকে ফলের প্লেট টা এগিয়ে দিয়ে বলল,” এটা তোমার জন্য”।
অনেকের প্লেটে ভাত, নুডুলশ, সাথে ডিম পরাটা। পিরামিড করে সাজান।
সতীকে দেখিয়ে বললাম, “ এত সকালে এত সব খাবে কি ভাবে”?
“ সবাই কি তোমার মতো? ওরা খাওয়ার জন্য বাচে”। বলে উঠে গেলো ফল আনতে।
বাহিরে এসে যখন দাঁড়ালাম তখন আটটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। সতীকে বললাম,” তুমি দাড়াও এই ফুল আর ফোয়ারার পাশে, হলিডে ভিলা লেখাটা নিয়ে ধরে রাখি তোমার স্মৃতি আমার এই ক্যামেরার মাঝে”।
ও বলল,” শুধু আমার কেন, আমাদের দুজনের স্মৃতি ধরা থাক এর ভিতর। ঐ লোক টাকে বলও ছবিটা উঠাতে”।
বলল ,”স্যার, আমরা প্রথমে যাবো স্ক্যাইক্যাব দেখতে, তারপর কালো বালির বীচে, ক্রকডাইল ফীডিং, শেষে বোট বিহারে”।
গাড়ী চলছে একেবেকে। কখনো পাহাড়ের পাশ দিয়ে, কখনো সমুদ্রের থেকে বেড়িয়ে আসা নদীর কিনারায় বাঁধা বোট গুলোকে বায়ে রেখে। সতী তাকিয়ে ছিল জানালা দিয়ে। সূর্যের আলো পরা ওড়না থেকে নীলাভ রঙ ছড়িয়ে দিলো ওর মুখমণ্ডলে। চিক চিক করছিল ওর পাথর কুচিতে গাঁথা কানফুল টা। মনে হচ্ছে আগুনের রশ্মি ছিটকে পড়ছে ওর কানফুল থেকে। আমি ক্যামেরা বের করলাম, সূর্যের তাপে ভেজা মুখটা ভেসে উঠল ক্যামেরার লেন্সএ। ক্লীক। গেঁথে গেলো অপূর্ব মুখমণ্ডলটা মেমোরি কার্ডের মাঝে।
গাড়ী এসে দাঁড়াল Machincang Mountain এর পাদদেশে। এখান থেকে আমরা যাবো ক্যাবেল কারে করে। Base Station থেকে Middle Station তারপর সেখান থেকে Top Stationএ। Langkawi Cable Car কে বলে SkyCab.
এটার অবস্থান Langkawi Island এর সাউথওয়েস্ট কোস্টে।
সেলিম বলল,” আপনাদের দের ঘণ্টা লাগবে দেখে ফিরে আসতে। আমি পিছনের পারকীং লটে থাকবো। নেমে এসে ফোন করেন”। আমাদের টিকিট কাঁটা ছিল। উঠে বসলাম। চার জনের বসার জায়গা। আমাদের সাথে একটা অল্প বয়স্ক যুগল। হতে পারে স্বামী স্ত্রী। হতে পারে প্রেমিক প্রেমিকা। ঢলে পড়ছে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে। মনে করিয়ে দিলো পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আমরা করেছি, এরা করছে, ওরাও করবে। এত চিরন্তন সত্য।
Base Station থেকে Middle Station এর দূরত্ব পাঁচ হাজার পাঁচশ ফিটের কিছু বেশি। আমরা যাচ্ছি ২০০০ ফুট উপর দিয়ে। নিচে বিভিন্ন রঙের বন্য ফুল। পাশে উঠে গেছে পাহাড়। এ শুধু দেখে উপলব্ধি করা যায়, বলে বোঝানো যায়না। সতী তাকিয়ে ছিল বাহিরের দিকে। অপর দিক থেকে ফিরে আসা একটা কেবেল কার থেকে একজন আমাদেরকে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানালো।
সতী হঠাৎ বলে উঠল,” দেখো, দেখো শমিত দা, পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনা পড়ছে। নিচে তাকাও তোমার মাথা ঘুরে যাবে”। ওর উচ্ছলতা আমার মনে এনে দিলো এক পরিতৃপ্তের ছোঁয়া।
আবারও আমি ফিরে গেলাম পিছনে। Alberta, Canada, ফিরছিলাম Glacier Mountain দেখে। সতীর মতো সে ও সেদিন বলে উঠেছিল,” দেখো, পাহাড় ভেঙ্গে ঝরনা বইছে। এই মন ভোলানো দৃশ্য কি আর আমি কোনদিন দেখতে পারবো তোমার সাথে”?
সে দেখাই ছিল শেষ দেখা।
“সতী, তাকাও আমার দিকে, পিছনের উচু পাহাড়টা নিয়ে তোমার ফটো উঠাবো”। ও তাকালও। ওর চোখে প্রাদা সানগ্লাসটা খুব সুন্দর মানিয়ে ছিল। বলল,” দেখি শমিত দা, কেমন উঠেছে”।
সামনের ছেলেটা বলল,” তোমার ক্যামেরাটা দাও, তোমাদের দুজনের ছবি উঠিয়ে দেই। আরও একটু closely বস, তা না হলে পিছনের রক পাহাড়টা আসছেনা”। আমি তাকালাম সতীর দিকে। সতী হেসে বলল,” সব জেন্ডার প্রবলেম”।
আমাদেরকে নামিয়ে দেওয়া হোল Viewing Platformএ। সেখান থেকে দেখতে পাচ্ছি Main island, আর সেই সাথে আসে পাশের Island গুলোর panoramic দৃশ্য। কাছের থেকে দেখা বন্য ফুল। মন কেড়ে নেয়।
এবার আমরা এলাম Top Stationএ। সেখান থেকে একটু হেটেই ২৩০০ ফিটের উপরে Machincang Mountainএর চুড়ায়,Sky bridgeএ। এটা হচ্ছে The Longest Free Span and Curved Bridge In The World। ৪১০ ফুট লম্বা এই ব্রিজ।
সোজা ব্রিজের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে এর অপর প্রান্ত দেখা যায় না। সোজা ব্রিজে দেখার মাঝে যেমন একটা এক ঘেয়েমী এটাতে তা নেই। শেষ প্রান্তের দৃশ্যটা জানা নেই কি দেখবো সেখানে যেয়ে।
আমি একটু এগিয়ে গিয়েছিলাম। পাশ ফিরে সতীকে না দেখে পিছনে তাকালাম। সতী আস্তে আস্তে হেটে আসছে একটা যুগলের সাথে। ওদের হাতে স্ট্রলার। একটা বাচ্চা বসা। কাছে আসতেই পরিচয় করিয়ে দিল, বিক্রম আর দ্রীবনী। দিল্লীতে থাকে। এসেছে তিনদিন হোল, এখান থেকে যাবে সিঙ্গাপুর। আমি আর বিক্রম কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলাম। বিক্রম ইঞ্জীনিয়ার। আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো কি ভাবে এই সাসপেন্ডেড ব্রিজ বানানো হয়েছে। আমার মাথায় কিছুই ঢুকলও না। ও কথা বলতে বলতে উদাস হয়ে তাকিয়ে রইল সামনে। যেখানে নীল আকাশ মিলেছে পাহাড়ের চুড়ায়। পিছনে ফিরে দেখি দ্রীবনী সতীকে কি যেন বলছে। সতীর চোখ ছলছল করছে। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
অবশেষে বিদায়ের পালা। বিক্রম বলল,” এই আমার ঠিকানা, কোন সময় দিল্লীতে এলে আমাকে কল করতে ভুলবেন না”।
অপুরুপ,মনোমুগ্ধকর, দৃশ্য দেখা শেষে নিচে নেমে এলাম। সতী বলল,” জানো দ্রীবনী কি বলছিল? ঐ ছোট্ট ছেলে টা—“
“ থাক সতী আমি শুনতে চাইনা। হৃদয় বিদারক ঘটনা আর নাই বা শুনলাম”।
“ তবে থাক, চলো ঐ ছায়ার নিচে বসি। তোমার ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করো। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে”।
বাহিরে তাপমাত্রা নব্বুই ডিগ্রী ফারেনহাইট। এখানে গ্রীষ্ম, শীত, বসন্ত বলে কোন ঋতু নেই। তাপমাত্রা সব সময় আশি, নব্বুই এর কোঠায়। সতী বলল,“ আমি একটু রেস্ট রুম থেকে হাতে, মুখে পানি দিয়ে আসি। তুমিও যাবে কি”?
বললাম,” না, তুমি যাও, আমি সেলিম কে কল করে গাড়ী আনতে বলি”।
সেলিম ফোন ধরল না। হয়তো ব্যস্ত কোন কারনে। অগত্যা আমাদেরকে যেতে হবে পারকীং লটে। সতী ফিরে এলো, হাতে দুটো ঠাণ্ডা পানির বোতল নিয়ে। বলল,” এই ঠাণ্ডা পানিটা খাও, তোমাকে আমি একেবারেই পানি খেতে দেখিনি”।
“ঠিক আছে। এখন চলো, সেলিম কে খুজতে হবে, ও ফোন ধরছে না”, বলে একটু এগোতেই দেখলাম সেলিম হেটে আসছে।
কাছে আসে বলল,” আমরা এখন যাবো কালো বালির বীচ দেখতে। আধা ঘণ্টার উপর লেগে যাবে। ওখানে যেয়ে লাঞ্চ করবো”।
ভোর চার টায় এসে পৌছালাম কুয়ালা লাম্পুর এয়ারপোর্টে। এত ভোরে লোক জনের আনাগোনা নেই বললেই চলে।
দুই একটা দোকান খোলা। সতী পুরো জার্নিতে ঘুমিয়ে এসেছিল। ফলে কিছুটা ফ্রেশ হয়েই সে নামলো। তবুও চেহারায় কিছুটা মলিনতার ছাপ।
আমরা ট্রানজিট যাত্রী। এর পরের প্লেন পাঁচ ঘণ্টা পর। আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। যাবো Langkawi. মাত্র এক ঘণ্টা লাগবে যেতে। ইমিগ্রেশন শেষে গেটের কাছে এলাম। বসার জাগায় শুধু আমরা দুজন। সতী কে বললাম,” সতী, তুমি তোমার ব্যাগটা মাথায় দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়। অনেকক্ষণ থাকতে হবে এখানে। আমি একটু ঘুরে দেখে আসি কোথাও নাস্তা পাওয়া যায় কিনা”।
“ যাও, তবে তাড়াতাড়ি চলে এসো। তুমি তো সারা রাত ঘুমাও নি। একটু শুয়ে নিলে পারতে”?
এখন নয়। একেবারে হোটেলে যেয়ে ঘূমাবো।
ভালো লাগলো এই ভেবে যে সতীর স্বাভাবিক আচরণ ফিরে এসেছে। ও শুধু হাসলও। ও জানে হোটেলে যেয়ে ঘুমানোর বান্ধা আমি নই।
একটা ফাস্ট ফুডের দোকান খোলা। ম্যাকডনালের আকারে সাজানো। তবে স্যান্ডউইচের আকার অনেক ছোট। করণীয় কিছু নেই। অন্যান্য দোকান গুলো খুলতে অনেক দেরী । সতী ও আমি দুজনেই রাতে কিছু খাইনি। এই মুহূর্তে পেটে কিছু দেওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, সতী ঔষধ খেতে পারবেনা কিছু না খাওয়া পর্যন্ত। অগত্যা দুটো স্যান্ডউইচ, সাথে এক কাপ কফি আর একটা চা (সতী চা ছাড়া কিছু খায়না) নিয়ে এলাম।
খাওয়া শেষে সতী উঠে গেলো রেস্ট রুমে। যাবার আগে বলল,” আমি একটু রুপচর্চা করে আসি। চেহারার যা শ্রী হয়েছে?
ও চলে গেলো। আমি বসে সুটকেস গুলো পাহারা দিতে লাগলাম। এর মধ্যে বেশ কিছু লোক এসে গেছে। সময়ও পেরিয়ে গেছে। সতী এলো। হাল্কা করে প্রলেপ লাগানো মুখে। সকালের কমল কুসুম আলোয় ওকে সুন্দর লাগছিল।
জিজ্ঞাসা করলাম,” কি বলও, বৌদির কথা শুনে ভুল করেছ বলে মনে হয়”?
“না, ভুল করিনি”।
যথা সময় প্লেনে এসে বসলাম। একঘণ্টা দশ মিনিটের পথ। সেই তুলনায় প্লেন টি বড়ই বলতে হবে। দুই তিন দুই এই সমন্বয়ে সীট ভাগ করা। আবারও জানালার পাশের দুটো সীট আমাদের জন্য বরাদ্দ। অবশ্য চেয়ে নিয়েছি। আগেই বলেছি সতীর পছন্দ জানালার পাশে বসা।
সকাল সাড়ে দশটায় এসে পৌছালাম Langkawi এয়ারপোর্টে। প্লেনে আরোহী খুব একটা বেশি না থাকাতে লাগেজ পেতে দেড়ি হলনা। বাহিরে বেড়িয়ে দেখলাম শুভঙ্করের নাম কাগজে লিখে একজন দাড়িয়ে। যেহেতু সেই সবকিছু ঠিক করেছিল।
হাত উঁচু করতেই ভদ্রলোক এগিয়ে এলো । চারিদিকে সে একবার তাকাল।
বললাম,” অন্য দুজন আসতে পারেনি”। একটু হেসে বলল,” আমার নাম রাম। এই মুহূর্তে আমি আপনাদের গাইড। আসুন”। এই বলে সে সুটকেস দুটো টেনে নিয়ে গেলো তার গাড়ীতে।
বললাম, “ মিস্টার রাম আমার সিম কার্ড লাগবে, কোথায় পাবো’?
কোন অসুবিধা নেই আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি “। এই কথা বলে পাশে সিম কার্ডের দোকানে নিয়ে গেলো। পকেট থেকে টাকা বের করতে যেয়ে টাকা গুলো পেলাম না। মনে আছে দুশ ডলার ভাঙিয়ে ছিলাম এয়ারপোর্টে। অস্থির হয়ে এ পকেট ও পকেটে বার বার হাত দিতেই সতী ডাকল আমাকে।
“শমিত দা, টাকা তুমি প্যান্টের পকেটে রাখুনী, রেখেছ জ্যাকেটের পকেটে। আর সেই জ্যাকেট আমার কাছে। এই নাও”। বলে টাকা গুলো বের করে দিলো।
বললাম,” দেখতও, তুমি না থাকলে কি অবস্থা হতো। হন্নে হয়ে খুজতাম। আর চুল ছিঁড়তাম”।
“জানি, তোমার ধৈর্য একটু কম”।
সতী সব কিছুতেই কাম এন্ড কুল। কোন কিছুতেই বিচলিত হয়না। এ একটা মস্ত বড় গুন ওর।
“ এদেশেই আমার জন্ম স্যার”। বলে আবারও বলল,” আমার বাবা কেরালা থেকে এসে ছিলেন এই দেশে অনেক আগে। আর ফিরে যায়নি। এদেশের পপুলেশনে ইন্ডীয়ানদের পারসেন্টেজ অনেক, স্যার”। বলে গর্বিত ভাবে আমার দিকে তাকাল।
রাস্তার চারিদিকে সারি সারি নারকেল গাছ। ছোট ছোট বাড়ী। মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশের ফেলে আসা যশোর শহরের কথা, ফেলে আসা কোটচাদপুরের কথা। আম, কাঁঠাল, নারকেল গাছের সারি। কিছুক্ষণের জন্য অন্নমস্কক হয়ে গিয়ে ছিলাম।
সতীর ডাকে ফিরে এলাম। “ এসে গেছি”। বলে হাতের ব্যাগ টা কাধে ঝুলিয়ে নিলো।
গাড়ী আসে থামল হলিডে ভিলার সামনে। সুন্দর ছিমছাম হোটেল। সামনে বিভিন্ন রঙে সাজানো বাগান। পাশে পানির ফোয়ারা। আমার ভালো লাগলো, সতীর ও। ও বলল,” কি সুন্দর তাই না শমিত দা”। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সূর্যের আলোতে চিকচিক করছে। চোখে রৌদ ঠেকানো প্রাদা চশমা। আমার দিকে তাকাতেই পকেট থেকে কাগজের নেপকিণটা এগিয়ে দিলাম।
“ মুছে নাও কপালের ঘামটা”।
“ কি করে বুঝলে?”
“অনেক দিন ধরে চলছি তোমার সাথে, এটুকু বুঝব না”?
ও হাসল।
রাম গাড়ী থেকে নামিয়ে দিলো সুটকেস গুলো। বলল,” স্যার, আজকে রেস্ট নিন, কাল আমাদের গাড়ী আসবে ভোর আটটায়। আপনাদের কে সব ইম্পরটেন্ট জাগা গুলো ঘুরে ঘুরে দেখাবে”।
জিজ্ঞাসা করলাম,” তুমি আসবে না”?
“ আমি যদি না আসতে পারি, এমন একজন কে পাঠাবো আপনাদের তাঁকে পছন্দ হবে”। বলে সালাম দিয়ে গাড়ী স্টার্ট দিলো।
কাউন্টারে এসে দাঁড়ালাম। দুইজন মহিলা কাজ করছে, দুইজনই ব্যাস্ত। সতী পাসপোর্ট দুটি আমার হাতে এগিয়ে দিলো।
বললাম,” ঐ চেয়ারটাতে বসো। দরকার পড়লে তোমাকে ডাক দেবো”।
এই মুহূর্তে মনে হোল ওর ভালো মন্দ সবকিছু দেখার ভার আমার। এই বিদেশ বিভুয়ে আমিই ওর একমাত্র বন্ধু। সে সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। এই মহান দ্বায়িত্ব আমার উপর দিয়েই বৌদি ওকে পাঠিয়েছে আমার সাথে। আমাকে পালন করতে হবে সেই দ্বায়িত্ব।
Can I help you?
ভদ্রমহিলা ডাকছে আমাকে। এগিয়ে গেলাম। পাসপোর্ট আর রিজার্ভেশনের কাগজ গুলো সে হাতে নিলো। আবারও চারিদিকে চাইল সে। বললাম চারজনের পরিবর্তে দুজন এসেছি। দেখতে চাইল অন্য জন কে।
সতীকে আসতে বললাম কাউন্টারে।
“Do you need two rooms?” বলে তাকাল আমার দিকে।
বুঝলাম এই সমস্যা আমাকে ফেস করতে হবে সবখানে। কারন আপাতদৃশটিতে এই ধরনের সম্পর্ক চিন্তা করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বললাম,” Yes, two rooms side by side if possible”.
সতী আস্তে আস্তে আমার কানে কানে বলল,” এ সবই জেন্ডারের প্রবলেম”।
দুটা রুম পাওয়া গেলো পাশাপাশি। ভদ্রমহিলা তার হাসি বজায় রেখে বলল, এক ঘণ্টা পরে এসো। রুমগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে।
“চলো, লাঞ্চ টা সেরে নেই”। বলে দুজন যেয়ে বসলাম হোটেলের ডাইং রুমে। সতী কে বললাম, তুমি পছন্দ মতো অর্ডার দেও। সে মালয়েশিয়ান ডিস আনতে বলল। আমরা বসে বসে কথা বলছিলাম। ডাইং রুমের চারিদিক খোলা। হয়ত বাহিরের
সৌন্দর্য দেখানো টাই মুল উদ্দেশ। অপূর্ব। চারিদিকে বিভিন্ন ফুলের সমারহ। একটু দূরেই সুইমিং পুল। আর একটু দূরে দেখতে পাচ্ছি হোটেলের প্রাইভেট বীচ। ঠিক করলাম বিকেলে হাটতে যাবো বীচের পাড়ে। আজ রীলেক্সের দিন।
একজন আসে খবর দিলো ঘর তৈরী। সতীকে বললাম,” বিশ্রাম নাও। বিকেল পাঁচটায় বের হবো”। ও চলে গেলো ওর, আমি এলাম আমার ঘরে।
সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। ছোট্ট বেল্কনী আছে। সেখান থেকে সুইমিং পুলটা দেখা যায়। অনেক ছোট বড় ছেলে মেয়েরা সাঁতার কাটছে, ডুব দিচ্ছে। কেউ বা রৌদ পৌহাচ্ছে। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে দেখলাম। তারপর বিছানায় এলিয়ে দিলাম ক্লান্ত শরীর টা।
“ এক মিনিট সময় দাও” বলে চোখে মুখে পানি দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।
বিকেলের ঝিরঝিরে বাতাস সকালের রৌদ্রের তাপটাকে কমিয়ে দিয়েছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি দুজনে। একদিকে অনেক উচু পাহাড়। সবুজের সমারোহ। আর এক দিকে বিভিন্ন ধরনের দোকান পাট, বিভিন্ন ধরনের রেস্টুরেন্ট।
বললাম,”সতী, কোন ধরনের খাবার রাতে খাবে ঠিক করে নেও। আর বীচে হাটতে গেলে বীচ স্যান্ডেল লাগবে, চলো, ঐ দোকান থেকে কিনে নেই”।
“চলো” বলে দুজনে এসে ঢুকলাম দোকানে। আমি নিলাম একটা ফ্লীপ-ফ্ললপ। সতী অনেক খুজে পারপেল রঙ এর একটা স্যান্ডেল পেলো। ওটার রঙ এর সাথে ওর পরনের আউট ফিটের রঙ মিলে গেলো।
বললাম,” নতুন স্যান্ডেল টা পড়ে নাও। আমরা বীচের দিকে যাব”।
আমিও ফ্লীপ-ফ্ললপ টা পায়ে দিয়ে নিলাম।
পরিষ্কার সচ্ছল পানি। কোন দিকে অপরিচ্ছন্নের বিন্দু মাত্র চিহ্ন নাই। কিছু লোক শুয়ে আছে বীচ বেঞ্চে। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাড়ে। দূরে স্পীড বোটে বাঁধা উরন্ত রঙ্গিন বালুনের মাঝে মানুষ উড়ছে। সতী আস্তে আস্তে গোড়ালি ভেজা পানিতে যেয়ে দাঁড়াল। ঢেউ আছড়ে এসে পড়ল ওর পায়ে।
বললাম ,”তাকাও, ছবি উঠাচ্ছি”।
ও তাকালও। হাসির রেখা ওর ঠোঁটে।
সূর্য ঢলে পড়লো সমুদ্রের শেষ প্রান্তে। আমরা এসে বসলাম বীচ বেঞ্চে।
সতী বলতে থাকলো তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আমি শুনতে শুনতে তাকিয়ে রইলাম, যেখানে আকাশ মিশেছে সমুদ্রের জলে।
ষোলই পৌষ, পয়লা জানুয়ারী। বাহিরে শীতের প্রকোপ ততটা নয়। সকালে সতীর দেওয়া সাদা সাল টা গায়ে দিয়ে বেল্কনীতে এসে বসলাম। হাতে কফির পেয়ালা। আকাশে পেজা পেজা নীল মেঘ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে । নরম সূর্যের আলো এসে পড়েছে আমার বেল্কনীতে। সামনের ছোট্ট বাগানে দুটো শালিক কোথা থেকে এলো জানিনা। দেখছিলাম শালিক দুটোকে। একে অপর কে মাঝে মাঝে ঠোকর দিচ্ছে আবার দূরে সড়ে যাচ্ছে। হয়তো এটাই ওদের ভালবাসা জানানোর প্রকাশ। আরও কিছুক্ষণ হয়তো ওদের নিয়ে ভাবতাম। কিন্তু হলনা।
দরজায় দুমদাম শব্দ। একমাত্র শুভঙ্করই জানায় এইভাবে তার আগমন বার্তা। দরজা খুলতেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল। কোন কিছু না বলে সোজা চলে গেলো আমার রান্না ঘরে। আমি শুধু চেয়ে রইলাম ওর দিকে। কফি মেশিনে তার পছন্দ ফ্লেভারের K-cupটা বসিয়ে আমার দিকে তাকাল।
“ কিরে? এত সকালে তুই কি কারনে? আর এত দুমদাম শব্দই বা করছিস কেন?” জানি একথা ওকে বলে কোন লাভ নেই।
ঠিক যা ভেবেছিলাম। এইসব কথা ওর কান দিয়ে ঢুকালো না। ও ভাবে এটা ওর বাসা। ওর অধিকার আছে যখন তখন আসার। সত্যি বলতে কি আমার বাসার এক গোছা চাবি ওর কাছে থাকে। ছোট বেলা থেকে দুজন এক সাথে বড় হয়েছি। হাসি কান্না ভরা দিন গুলো পাড় করেছি। কাজেই আমার এই ছোট্ট এপার্টমেন্টের উপর ওর যে অধিকার তা আমি কেড়ে নেইনি। ওর উচ্ছ্বাস, ওর হাসি আমাকে আনন্দ দেয়।
“কি ভেবে এত সকালে?” আবারও আমার জিজ্ঞাসা।
“ খুব ভালো একটা ডিল দিয়েছে মালয়েশিয়া যাওয়ার। দশ দিনের মধ্যে রওয়ানা দেবো। তোর পাসপোর্ট টা দে টিকেট কাটতে হবে। আর সতী কে খবর দে। ওকেও যেতে হবে আমাদের সাথে। তোর কোন প্রশ্ন থাকলে আমাকে নয় তোর বৌদিকে কল কর”। এত গুলো কথা বলে সে আমার দিকে তাকাল।
“ ধীরে বন্ধু, ধীরে। আমার যে সময় আছে তোকে কে বললে। আর সতী ই যে যাবে তার গ্যারান্টি তোঁ আমি দিতে পারব না”। জানি একথা ধপে টিকবে না। আমি রিটায়ার্ড। অফুরন্ত সময় আমার হাতে। সে সেই কথা জানে। আমারও যে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তা নয়। অনেক দিন ধরে গুমট অন্ধকারে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি। একটু আলো বাতাস দরকার। কবে যে শেষ বেড়াতে বেড়িয়েছিলাম আজ তা মনে পড়ে না।
সতী আমার বান্ধবী। আমার সাথে সতীর সম্পর্ক শুধু বন্ধুত্তের। একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করি সেই সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলি। কথার ছলে ঠাট্টা, আবার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সময় কেটে যায় আমাদের।
শুভঙ্কর বলে উঠলো,” কি ভাবছিস?”
“ না, কিছু না। তুই আমার পাসপোর্ট নিয়ে যা। আর আমি সতীর সাথে কথা বলে দেখি।“
“ গুড বয়,” এই কথা বলে সে কফির শেষ অংশ টা গলায় ঢেলে দিলো। পাসপোর্ট টা হাতে পেয়েই যে ভাবে ঝরের মতো এসে ছিল সেই ভাবেই বেড়িয়ে গেলো।
শুভঙ্করের বাসায় আড্ডাটা ভালোই জমেছিল। বৌদির হাতের রান্নার কোন তুলনা নেই। মাঝে মাঝে তার ছিটে ফোঁটা আমার বাসাতেও আসে। সতীর মুখে চোখে আনন্দের ধারা বইছে। কলকল করে বলে উঠল,” জানো বৌদি I am so excited. শোন তুমি আর আমি কিন্তু এক রুমে থাকব। ওরা দুজন অন্য ঘরে”।
শুভঙ্কর শুনে চিৎকার করে উঠল,” সে কি, আমি আমার বৌ কে নিয়ে থাকতে পারবো না বিদেশ বিভুয়ে। আমার যে অনেক দিনের সাধ বিদেশ বিভুয়ে এক সাথে এক রুমে থাকা ”।
“না,” হাসতে হাসতে সতী বলল। “ অনেক থেকেছ, ছয়টা দিন না থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হবেনা”। বলে বৌদির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,” কি বলও,বৌদি”?
সাতদিন পরে আমরা রওয়ানা দেবো। প্রথমে Langkawi. সেখানে তিন রাত। তারপর কুয়ালা লাম্পুর। দিন গুনছি। অনেকদিন পর বাহিরে যাবো বলেই হয়তো এক অজানা শিহরন সাড়া মনে।
দিন গুলো পেরিয়ে চার দিনে এসে দাড়িয়েছে। সকাল আটটা। ফোনটা বেজে উঠল। শুভঙ্করের। গলারা স্বরে আতংক।
শুভঙ্কর বলল, “ একশ চার জ্বর। সেই সাথে বমী। রাত থেকে। এক বন্ধু ডাক্তার দেখে গেছে। ঔষধ পড়াতে এখন বমী বন্ধ হয়েছে। তোর বৌদি তোকে আসতে বলেছে। কথা আছে।“
“কি কথা?”
“সেই বলবে, তুই বোস।“ বলে শুভঙ্কর বেড়িয়ে গেলো।
বৌদি ডাকল ওর পাশে বসার জন্য।
আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল “ শমিত দা, আমার মালয়েশিয়ায় যাওয়া হবেনা। এই শরীর নিয়ে যেতে পারবো না। তুমি আর সতী ঘুরে এসো”।
এই কথা শোনার জন্য তৈরী ছিলাম না। বললাম “ না, বৌদি। তা হয়না। তুমি তো বোঝো কেন আমি না করছি। আর তাছাড়া সতীই বা রাজি হবে কেন?” বৌদি কে বোঝাবার চেষ্টা করলাম।
সে বলল,” তুমি সতী কে আসতে বলও। আমি ওর সাথে কথা বলব। আর তোমরা একে অপর কে চেনও। জানো, বন্ধুত্ত দিয়ে গড়া তোমাদের সম্পর্ক। তোমাদের মধ্যে যে পবিত্রতা আমি দেখেছি তাতে কে কি বলল তা নিয়ে মাথা ঘামাবে কেন”।
আমি আর কথা বাড়াই নি। সতী কে আসতে বললাম।
সতী এলো। আমি উঠে অন্য ঘরে চলে গেলাম।
কিছুক্ষণ পড়ে আমার ডাক পড়ল। বৌদির মাথার কাছে সতী বসা। বৌদি বলল,”সতী রাজি আছে। তুমি বাবস্থা কর যাওয়ার”।
আমি চাইলাম সতীর দিকে।
২
রাত সাড়ে এগার টায় ফ্লাইট। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসে। আমরা দুজন। এই ভ্রমনের সবকিছু যারা ঠিক করেছিল আজ তাঁরাই রয়ে গেলো পিছনে। বিধাতার কি খেলা। সতীর মুখ দেখে মনে হোল এই যাত্রা না হলেই বোধহয় ভালোছিল।
কথার মাঝে মাঝে অন্যমনস্কতা । বললাম,” যদি comfort ই feel না করো তবে রাজি হলে কেন”?
বলল,” বৌদি বলেছিল “আমি তোমার বড় বোন। আমি যদি মনে করতাম শমিতের সাথে তোমার একলা যাওয়া উচিত নয় তবে তোমাকে আমি যেতে বলতাম না। আমি চাই তোমরা ঘুরে আসো”।” এই বলে সতী তাকাল আমার দিকে।
“ তাহলে তোঁ সব ল্যাটা চুকে গেছে। এবার ইনজয় করার চেষ্টা কর”। বলে আমি ঊঠে গেলাম ফ্লাইট বোর্ডে গেট নম্বার দিয়েছে কিনা দেখার জন্য।
“কেন, তোমার লাগবে না”? বলে সে সীট বেল্ট টা বেধে নিলো।
“না, যার নরম বিছানায় ঘুম আসেনা সে এই হেলান দেওয়া চেয়ারে ঘুমাবে কি ভাবে? তার চেয়ে একজনের ঘুমটা যেন সম্পূর্ণ হয় তাই কি ভালো না?” বলে বালিশ টা এগিয়ে দিলাম।