পোস্ট মরটমের রিপোর্ট অনুসারে খুন হয়েছে রাত বারোটার পরে। আফসারউদ্দিন বার বার রিপোর্ট টা পড়ল। পাঁচটা
ছুরির একটাতেও হাতের ছাপ নেই এটাই রহস্য।
রহমত এসে খবর দিলো পাঁচজনের খোজ পাওয়া গেছে। সবাইকে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আফসার উদ্দিন বাহিরে এসে দাঁড়াল। আকাশটা আজ মেঘলা। লোকদের মনে খুশীর বন্যা বইছে। রাখাল মারাগেছে। দু এক জাগায় ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। একথা আফসারউদ্দিনের কানে এসেছে।
কনেস্টবল রহমান খোদেজা আর ওর মাকে নিয়ে এলো পুলিশ ষ্টেশনে। খোদেজার মাকে ওয়েটিং রুমে বসতে বলে আফসারউদ্দিন রহমত কে বলল খোদেজাকে ইনটারোগেশন রুমে নিয়ে যেতে। খোদেজা বোরখা পরে এসেছিল যাতে লোকেরা চিনতে না পারে। পাঁশে খুলে রেখে দিলো। বয়স ষোল সতেরো হবে। চোখে হিংস্রতার ছাপ।
“ ওর যে গলা কাটা হয়নি তা তুমি জানলে কি ভাবে? তুমি তো থাকো অনেক দুরের গ্রামে”?
“ঐ লম্পটের মরার খবর বাতাসের আগেই চলে এসেছিল। এখন বলেন আমাকে ডেকে এনেছেন কেন”?
“ ঐ রাতে তুমি কোথায় ছিলে?” জিজ্ঞাসা করলো আফসারউদ্দিন ।
“কেন? আমাকে সন্দেহ করছেন?”
“অস্বাভাবিক তো কিছু নয়। তবে প্রমান সাপেক্ষ”।
“ওর গলাটা আর একটা অঙ্গ যদি আমি নিজে হাতে কাটতে পারতাম তবে আমার প্রান জুড়াত। যে সর্বনাশ সে আমার করেছে আপনি তা বুঝবেন না। আপনারা জানেন শুধু টাকা খেয়ে চোখ বন্ধ করে থাকতে। সেদিন কেন তার বিচার হয়নি? সেদিন কেন প্রমান হোল আমি খারাপ মেয়ে আর সে সাধু”। উত্তেজিত হয়ে কথা গুলো বলে একটু থামল সে।
তারপর দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বলল,“ঐ রাতে আমি আমার বান্ধাবী রওশন আর তার স্বামীর সাথে গোপালপুরের মেলায় গিয়েছিলাম। খোজ নিয়ে দেখতে পারেন। ফিরতে অনেক রাত হয়েছিল”।
“ আমি খুন করিনি”। তীব্র স্বরে বলল খোদেজা। “বললাম না আপনাকে ওকে খুন করতে পারলে আমার হাড় জুড়াত”।
সেই রাতে আমি মেলাতে ছিলাম” বলল সে।
আফসারউদ্দিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, ভাবল ওর এই কঠোর ভাবে কথা বলার মাঝে কোন রহস্য আছে কিনা।
আমি আসছি বলে বেরিয়ে গেলো, ডাক দিলো রহমত কে, বলল দীলীপকে ডেকে আনতে।
দীলীপ আসতেই ওকে একটা চিরকুট দিয়ে পাঠিয়ে দিলো। বলল, গাড়ী নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি যাবে আর আসবে”।
দীলীপ দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
আফসারউদ্দিন রহমত কে ডাক দিয়ে বলল খোদেজা কে নিয়ে যেতে। ওয়েটিং রুমে বসাতে বলল।
বেরিয়ে এসে আফসারউদ্দিন দেখল খোদেজার মা বসে আছে। বাম চোখ কালো ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা।
আফসারউদ্দিন একবার তাকাল খোদেজার মার দিকে।
রহমত কে বলল চম্পা কে নিয়ে আসতে।
“তোমার নাম চম্পা, চম্পা কি?”
“চম্পা বিশ্বাস।‘
“ তুমি তো কলেজে যাচ্ছও? তাই না?”
“হা”
তোমাকে আমি কেন ডেকেছি বুঝতে পারছ?
“জানি কেন ডেকেছেন এবং আপনি খোজ নিন আমার কলেজে। জানতে পারবেন সে রাতে আমার ইস্পেশাল ক্লাস ছিল।
খুন আমি করিনি, তবে ইচ্ছা যে হয়নি তা নয়। সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি যদি আমি পেতাম তবে ওকে খুন করতে আমি দ্বিধা করতাম না। কে করেছে যদি জানতে পারতাম তবে তাকে সহস্রও বার প্রনাম করতাম। আজও লোকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে আড়চোখে তাকায়। বাবা মা কে রাস্তায় অপদস্ত করে। আর আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। এক গ্রাম ছেড়ে আর এক গ্রামে চলে গেছি তাও রেহায় নেই। বলতে পারেন কবে আমি আবার চোখ তুলে চাইতে পারব। বলতে পারেন কবে একজন এসে আমাকে বলবে “তোমার অতীত আমি জানতে চাইনা জানতে চাই তোমাকে”। আপনারা তোঁ পুতুল। যখন যে যে ভাবে নাচায় সেই ভাবে নাচেন।“
আফসারউদ্দিন কিছু বলার আগেই রহমত এসে পাশে দাঁড়াল। চোখে ইঙ্গিত করতেই আফসারউদ্দিন বেরিয়ে গেলো।
বাহিরে দাঁড়ান রওশন আর তার স্বামী।
আফসারউদ্দিন তাদেরকে ডেকে নিয়ে গেলো তার চেম্বারে। জিজ্ঞাসা করল খোদেজা যা বলেছে সত্যি কি না।
ওদের হাঁ সূচক উত্তরে আফসারউদ্দিন ওদেরকে যেতে বলে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে রইল।
কোথায় যেন একটা গরমিল আছে মনে হোল আফসারউদ্দিনের। ডাক দিল রহমত কে। বলল,” ওদের পাঁচজন কে যেতে বলও তবে গ্রাম ছেড়ে বাহিরে যেন না যায়।“
আর শোন, এখনি একটু বের হতে হবে। গাড়ী ঠিক করেতে বলও।
রহমত বেরিয়ে গেলো।
গাড়ী নিয়ে আফসারউদ্দিন আর রহমত এসে পৌছাল সেই বাংলো তে। ঘরের ভিতর টা আর একবার ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চায়। ঘরের ভিতর এসে দাঁড়াল দুজন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো কোন কিছু চোখে পড়ে কিনা।
“স্যার?”
রহমতের দিকে তাকাল আফসারউদ্দিন।
রহমত আঙ্গুল দিয়ে দেখালও ঘরের কোনে পড়ে থাকা বস্তু টির দিকে। চকচক করছে।
বড় একটা বোতাম। কোটের বোতামের মতো মনে হোল আফসারউদ্দিনের। হাতে গ্লভস পড়ে বোতামটা উঠিয়ে নিয়ে রাখল পকেট থেকে বের করা রুমালের ভিতর। চারিদিকে তাকাল আর একবার। বের হয়ে এলো রুম থেকে।
বলল রহমতকে “ আশে পাশের বাড়ীর লোকদের কে জিজ্ঞাসা বাদ করতে হবে। কেউ কিছু হয়তো দেখেছে যা আমাদের কাজে লাগতে পারে”।
বাংলোর পিছনে বাঁশঝাড়। তার মাঝ দিয়ে পায়ে চলা পথ। সেই পথ যেয়ে পড়েছে বড় রাস্তায়। তার পাশে লোকদের বসতি।
সেই পথ দিয়ে চলতে যেয়ে আফসারউদ্দিনের চোখে পড়ল সাদা একটা কাপড়ের টুকরা বেধে আছে ছোট্ট একটা বাঁশের মাথায়। শাড়ীর ছেড়া অংশ মনে হোল। উঠিয়ে নিয়ে সযত্নে করে রেখে দিলো পকেটে।
প্রথম বাসাতে টোকা দিতেই সুলতান বেরিয়ে এলো। পুলিশ দেখে ঘাবরিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আফসারউদ্দিন জিজ্ঞাসা করলো সেই রাতে এমন কিছু তার চোখে পড়েছে কিনা অথবা কাউকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে কিনা ঐ বাংলো থেকে যা স্বাভাবিক নয়।
না দেখেনি। বলল সুলতান
পাশের বাসায় থাকে শমশের আলী। রহমত ডাক দিলো শমশের আলীকে। বেরিয়ে এসে সালাম দিয়ে দাঁড়াল শমশের।
পিছন ফিরে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই শুনতে পেলো এক মহিলার কণ্ঠস্বর।
“ উনাদেরকে দাড়াতে বলো ”।
“ কিছু বলবেন?” জিজ্ঞাসা করলো আফসারউদ্দিন।
“ দেখেছি একজন কে সাদা শাড়ী পড়া”।
“সাদা শাড়ী পড়া”? প্রশ্ন করলো, সাথে সাথে মনে হোল পকেটে রাখা সাদা টুকরো অংশ টার কথা।
“হাঁ”
“ চিনতে পেরেছেন?”
“না, তবে—“
“তবে কি?” জিজ্ঞাসা করলো আফসারউদ্দিন
“ একটা চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা”।
“ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা?” বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল আফসারউদ্দিন।
“আপনি ঠিক বলছেন?”
“জি, আমি সেই রাতে বাঁশ বাগানের ঐ রাস্তায় গিয়েছিলাম ছাগল টাকে আনার জন্য। হনহন করে সাদা কাপড় পড়া মেয়েটা আমার পাশ দিয়ে চলে গেলো। একটু হলেই আমাকে ধাক্কা দিতো।“
“ ঠিক আছে”। কিছু জিজ্ঞাসা না করে আফসারউদ্দিন রহমতকে নিয়ে ফিরে এলো থানায় । মাথার মধ্যে ঘুরছে শুধু একটা কথা, “ এক চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা”।
রহমত কে বাসায় যেতে বলে সেও ফিরে এলো তার বাসায়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। কোন রকমে রাতটা কাটিয়ে
ভোর হতেই নাস্তা শেষ করে বাড়ীর কাজের লোকটাকে বলল রহমত কে ডেকে আনার জন্য।
রহমত এসে দাড়িয়ে ছিল বাহিরে। বুঝে উঠতে পারলনা এতো ভোরে কেন তার ডাক পড়ল।
আফসারউদ্দিন বেরিয়ে এসে রহমত কে বলল এখনি খোদেজার মা কে প্রথমে, এবং অন্য চার জনের মা কে পরে নিয়ে আসতে। রহমত বেরিয়ে যেতেই আফসারউদ্দিন এসে বসল তার চেম্বারে। মনে মনে ভাবল আবার রহস্যের জাল খুলবে।
আধাঘণ্টা পরে রহমত ফিরে এলো খোদেজার মা কে নিয়ে। ওয়েটিং রুমে বসিয়ে আফসারউদ্দিনকে খবর দিলো।
বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করলো আফসারউদ্দিন। পেরিয়ে গেলো এক ঘণ্টা।
ডাক দিলো রহমত কে।
খোদেজার মা কে ইনটারোগেশন রুমে নিয়ে যেতে বলে একটা সিগারেট ধরিয়ে দুই টান দিয়ে ফেলে দিলো আফসারউদ্দিন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল বাহিরের দিকে। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো ইনটারোগেশন রুমের দিকে।
খোদেজার মা মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। আফসারউদ্দিন ঢুকতেই চোখ তুলে চাইল সে। আফসারউদ্দিনের দৃষ্টি ওর কালো ব্যান্ডেজে বাঁধা চোখটার দিকে।
“ ওরা চারজন স্বীকার করেছে তোমরা রাখালকে হত্যা করেছ। আর তুমি দলের নেত্রী।“ এই মিথ্যে কথার চালটা চেলে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
“না আমি করিনি”। দৃঢ় তার সাথে বলল খোদেজার মা।
আফসারউদ্দিন উঠে বাহিরে যেয়ে ফিরে এলো হাতে সাদা একটা শাড়ী নিয়ে। সেটা সে খোদেজার মার বাসা তল্লাশি করে আগেই এনে রেখেছিল।
“ এই শাড়ীটা টা তোমার, তাই না?” জিজ্ঞাসা করলো আফসারউদ্দিন
“ হাঁ, তাতে কি প্রমান হয়েছে?”
আফসারউদ্দিন শাড়ীটার ভাজ খুলল। একটা জাগায় কিছুটা অংশ নেই।
দেখাল খোদেজার মা কে। তারপর পকেট খেকে বের করলো সেই অংশ টুকু।
“ এই অংশ টুকু পাওয়া গেছে বাঁশঝাড়ে। দেখো চিনতে পারো কিনা?” বলে তাকিয়ে থাকলো ওর মুখের দিকে।
আমরা এসে দাঁড়ালাম ওর সামনে। পাঁচটা ছুরি এগিয়ে দিলো মুকুল। প্রতিশোধ নিতে হবে। রাখালের চোখে আতংকের ছাপ। আমাদের শরীরের রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। আমরা পাচজন ছুরি উঠিয়ে নিলাম হাতে। কিন্তু পারলাম না। পারলাম না ওর বুকে বিঁধিয়ে দিতে।
মুকুল ছুরি গুলো নিয়ে নিলো আমাদের হাত থেকে। গেঁথে দিলো এক একটা ছুরি এক একটা মেয়ের নামকরে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরল। ভয় আমরা পাইনি। কোন অনুশোচনা হয়নি আমাদের । বরং একটা পিশাচ মরেছে, বেচে গেছে অনেকে”। বলে থামল খোদেজার মা।
মুকুলের গায়ে কি কোট ছিল? জিজ্ঞাসা করলো আফসারউদ্দিন।
“হাঁ”
আফসারউদ্দিন আর কোন প্রশ্ন না করে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। ডাক দিলো রহমত কে।
“গাড়ী বের করতে বলো । সাথে চারজন পুলিশ নিয়ে নাও। সলেমানপুরে যেতে হবে”।